Summary
কুরআন শব্দটি আরবি, যার অর্থ "পঠিত"। এটি ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর উপর নাজিল হওয়া সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। কুরআন ২৩ বছরে খণ্ড খণ্ড করে নাজিল হয় এবং এর সূরাসমূহ মক্কি ও মাদানি নামে দুটি ভাগে বিভক্ত।
কুরআনের মধ্যে 114টি সূরা আছে, যার মধ্যে 86টি মক্কি এবং 28টি মাদানি। এর অর্থ মানব জাতির হিদায়াতের মূল উৎস। কুরআন নৈতিক, মানবিক আদর্শ এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের পথ প্রদর্শন করে।
কুরআনের বিভিন্ন নাম যেমন আল-ফুরকান, আল-হুদা, আর রাহমাহ, আয-যিকর, এবং আন-নুর এর যে বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে নামকরণ করা হয়েছে।
এই মহাগ্রন্থ মানুষের জন্য নৈতিক ও মানবিক আদর্শ প্রচার করে ও ইসলামি শরিয়াহের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। এটি সকল প্রকার সমস্যার সমাধানের নির্দেশনা প্রদান করে এবং এর শিক্ষাগুলি পরিষ্কার এবং যুক্তিসঙ্গত।
কুরআন মানবজাতির মুক্তির সনদ, যা মানুষকে আলোর দিকে পরিচালনা করে এবং শান্তি ও কল্যাণের পথ দেখায়। তাই কুরআন পড়া, এর অর্থ বোঝা এবং মোতাবেক আমল করা উচিত।
পরিচয়
কুরআন শব্দটি আরবি। এটি কারউন শব্দমূল থেকে উদ্ভূত। কারউন অর্থ পড়া বা পাঠ করা। অতএব, কুরআন শব্দের অর্থ হলো পঠিত। আল-কুরআন পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি পঠিত কিতাব। প্ৰত্যেক দিনই লক্ষ-কোটি মুসলমান এ গ্রন্থ তিলাওয়াত করে থাকে। আমরা পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে এ গ্রন্থ থেকে বিভিন্ন সূরা ও আয়াত পাঠ করে থাকি। এ জন্য এ কিতাবের নাম রাখা হয়েছে আল-কুরআন। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য হযরত জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে মহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর উপর যে কিতাব নাজিল করেছেন তাকেই আল-কুরআন বলা হয়। এটি সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। সর্বকালের সকল মানুষের জন্য এ কিতাব হিদায়াতের উৎস।
আল-কুরআন ‘লাওহি মাহফুযে' বা সংরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ । এটি প্রথমে কদরের রাতে প্রথম আসমানের ‘বায়তুল ইয়্যাহ’ নামক স্থানে এক সাথে নাজিল করা হয় । এরপর সেখান থেকে আল-কুরআন আমাদের প্রিয়নবি (স.)-এর উপর নাজিল করা হয়। মহানবি (স.)-এর ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকাকালে সর্বপ্রথম সূরা আলাকের ৫টি আয়াত অবতীর্ণ হয়। তারপর রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবদ্দশায় প্রয়োজন অনুসারে অল্প অল্প করে নাজিল করা হয়। এভাবে ২৩ বছরে খণ্ড খণ্ড আকারে পুরো কুরআন নাজিল হয়।
আল-কুরআনের সূরাসমূহ দুইভাগে বিভক্ত । যথা- মক্কি ও মাদানি। মহানবি (স.) আল্লাহর নির্দেশে নবুয়তের ত্রয়োদশ বর্ষে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। নবি করিম (স.)-এর এ হিজরতের পূর্বে নাজিল হওয়া সূরাসমূহ মক্কি সূরা হিসেবে পরিচিত। এ সূরাসমূহে সাধারণত আকাইদ সংক্রান্ত বিষয়সমূহ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন- তাওহিদ, রিসালাত, আখিরাত, বেহেশত-দোযখ, কিয়ামত ইত্যাদি হলো মক্কি সূরাগুলোর বিষয়বস্তু। অন্যদিকে মহানবি (স.)-এর মদিনায় হিজরতের পর নাজিলকৃত সূরাসমূহকে মাদানি সূরা বলা হয়। এ সূরাসমূহে সালাত, যাকাত, সাওম, হজ, জিহাদ, হালাল-হারাম, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিধি-বিধান বর্ণনা করা হয়েছে।
আল-কুরআনের বেশ কিছু নাম রয়েছে । আল-কুরআনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের আলোকে এ নামসমূহ রাখা হয়েছে । এগুলো আল-কুরআনের বিশেষ মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে । নিম্নে এর কতিপয় নাম উল্লেখ করা হলো-
ক. আল-ফুরকান (পার্থক্যকারী) : আল-কুরআন সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যকারী। এ জন্য একে আল-ফুরকান বলা হয়।
খ. আল-হুদা (হিদায়াত, পথপ্রদর্শন) : কুরআন মজিদের মাধ্যমে ন্যায় ও সত্যের দিকে পথ প্রদর্শন করা হয় বলে একে আল-হুদা নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
গ. আর রাহমাহ (রহমত, দয়া, করুণা) : পবিত্র কুরআন বিশ্ববাসীর জন্য রহমত ও করুণাস্বরূপ। তাই একে রাহমাহ বলা হয়েছে।
ঘ. আয-যিকর (উপদেশ, আলোচনা) : কুরআন মজিদে বহু ঘটনার আলোচনা ও বহু উপদেশ রয়েছে। তাই একে যিকর নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
ঙ. আন-নুর (জ্যোতি, আলো) : পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে হালাল-হারামের রহস্য উদ্ভাসিত হয়, তাই একে ‘নুর' বলা হয়।
কুরআন মজিদ ৩০টি (ত্রিশটি) ভাগে বিভক্ত । এর প্রতিটি ভাগকে এক একটি পারা বলা হয়। এর সূরা সংখ্যা মোট ১১৪টি। এগুলোর মধ্যে ৮৬টি সূরা মক্কি এবং ২৮টি সূরা মাদানি । আল-কুরআনে সর্বমোট ৭টি মনজিল, ৫৪০টি রুকু ও ১৪টি সিজদার আয়াত রয়েছে। এর আয়াত সংখ্যা সর্বমোট ৬২৩৬টি, মতান্তরে ৬৬৬৬টি।
আল-কুরআনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা
আল-কুরআন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাগ্রন্থ । আল-কুরআন আমাদের আল্লাহ তায়ালার পরিচয় দান করে। আমরা আল্লাহ তায়ালাকে চিনতাম না। তাঁর ক্ষমতা ও গুণাবলি সম্পর্কে জানতাম না। আল্লাহ তায়ালা অনুগ্রহ করে আমাদের প্রিয়নবি (স.)-এর উপর কুরআন মজিদ নাজিল করেন। মহানবি (স.) আমাদের আল-কুরআন শিক্ষা দেন। ফলে আমরা আল্লাহ তায়ালার পরিচয় লাভ করি। তাঁর আদেশ- নিষেধ জানতে পারি। কী কাজ করলে তিনি খুশি হন আর কোন কাজ করলে তিনি অসন্তুষ্ট হন তাও জানতে পারি। আল-কুরআন না থাকলে এগুলো সম্ভব হতো না। অতএব বোঝা গেল যে, মানব জীবনে আল-কুরআনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
আল-কুরআন মানব জাতির হিদায়াতের প্রধান উৎস। কোন পথে চললে মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ লাভ করবে আল-কুরআন তা আমাদের দেখিয়ে দেয়। পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ইত্যাদির পরিচয় দান করে। আল-কুরআনের নির্দেশনামতো চলে আমরা কল্যাণ লাভ করতে পারি। আখিরাতে আল-কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। দুনিয়াতে যে ব্যক্তি আল-কুরআনের নির্দেশ মেনে চলবে সে হবে মহাসৌভাগ্যশালী। সে পাবে চিরশান্তির জান্নাত। আর যে কুরআন মজিদের আদেশ নিষেধ মানবে না তার স্থান হবে যন্ত্রণাদায়ক জাহান্নামে৷
আল-কুরআন আমাদের নৈতিক ও মানবিক আদর্শ শিক্ষা দেয়। আল-কুরআন অনুসরণ করে আমরা উত্তম চরিত্রবান ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারি । ফলে সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হবে। অন্যায়, অত্যাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি দূরীভূত হবে।
কুরআন মজিদ সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। এটি কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা নির্দিষ্ট জাতির জন্য নাজিল হয় নি। বরং এটি সর্বজনীন ও সর্বকালীন মহাগ্রন্থ। কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ আসবে সকলের হিদায়াতের জন্য এ কুরআন নাজিল হয়েছে।
আল-কুরআনের শিক্ষা
কুরআন মজিদ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎস। এটি যাবতীয় জ্ঞানের ভাণ্ডার। এছাড়া মানুষের জীবনে যেসব সমস্যার উদ্ভব হয়ে থাকে তার সমাধানের ব্যাপারে এতে ইঙ্গিত রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
অর্থ : “আমি এ কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দেই নি।” (সূরা আল-আনআম, আয়াত ৩৮)
আল-কুরআনের সকল জ্ঞান ও শিক্ষাই সুস্পষ্ট। সংক্ষিপ্ত ও প্রামাণ্য। এতে উল্লেখিত সকল প্রকার আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধান সমগ্র বিশ্বের সকল মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য, যুগোপযোগী ও যুক্তিসংগত। এ কিতাবে কোনোরূপ সন্দেহের অবকাশ নেই। এটি সকল প্রকার ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে। আল-কুরআনের প্রথমেই আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
অর্থ : “এটি সেই কিতাব, যাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই ।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২)
আল-কুরআন ইসলামি শরিয়াহ'র প্রধান উৎস। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবন কেমন হবে তা এ কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। মানুষ কীভাবে ইবাদত করবে, কীভাবে চরিত্র গঠন করবে তাও এ কিতাবে উল্লেখ রয়েছে। প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ হযরত শাহ ওয়ালি উল্লাহ (র.)-এর মতে, আল-কুরআনে বহু জ্ঞানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এগুলো মোট পাঁচভাগে বিভক্ত। যথা-
১. ইলমুল আহকাম বা বিধি-বিধান সম্পর্কিত জ্ঞান।
২. ইলমুল মুখাসামা বা বিতর্ক বিদ্যা।
৩. ইলমুত তাযকির বি আলা ইল্লাহ বা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ ও নিদর্শন সম্পর্কিত জ্ঞান।
৪. ইলমুত তাযকির বি আইয়ামিল্লাহ বা আল্লাহ তায়ালার সৃষ্টিজগতের অবস্থা, তাঁর প্রদত্ত পুরস্কার ও শাস্তি সংক্রান্ত জ্ঞান।
৫. ইলমুত তাযকির বিল মাউত ওয়ামা বাদাল মাউত বা মৃত্যু ও পরকাল সম্পর্কিত জ্ঞান।
প্রকৃতপক্ষে আল-কুরআন মানবজাতির মহামুক্তির সনদ। এটি মানুষকে আলোর দিকে পরিচালনা করে। শান্তি ও কল্যাণের পথ দেখায়। সুতরাং আমরা আল-কুরআন পড়ব। এর অর্থ জানব এবং তদনুযায়ী আমল করব। আল-কুরআনের জ্ঞান শিক্ষা করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করব।
| কাজ : এ পাঠ পড়ে কুরআন মজিদের শিক্ষা সম্পর্কে শিক্ষার্থী যা জানতে পেরেছে তা তার পাশের বন্ধুকে বলবে। |